আকাশ থেকে ঝড়ে গেলো দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র যা কখনো পূরণ হবার নয়


কে এম রাজীব : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গণ এবং সংগীতাঙ্গণের আকাশ থেকে একই দিনে ঝড়ে গেলো দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র যা কখনো পূরণ হবার নয়। একজন গুণী সংগীত পরিচালক, অসংখ্য কালজয়ী গানের সুরকার আলম খান, আরেক জন, মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রের গুণী অভিনয় শিল্পী শর্মিলী আহমেদ। শুক্রবার (৮ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানী শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান আলম খান, একই দিন সকালে নিজ বাসাতেই মারা যান শর্মিলী আহমেদ। শুক্রবার ৮ জুলাই বাদ আসর এফডিসিতে আলম খানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে ৯ জুলাই শ্রীমঙ্গলে দাফন করার কথা রয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৮ বছর। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তিনি পপসম্রাটখ্যাত আজম খানের আপন বড় ভাই। ২০১১ সালে আলম খানের ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন দেশ বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। আলম খানের স্ত্রী গুলবানু তিনি মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। তাঁদের দুই ছেলে আরমান খান ও আদনান খান দুজনই সংগীত পরিচালক এবং একমাত্র মেয়ে আনিকা খান।

আলম খান ১৯৬৩ সালে রবিন ঘোষের সহকারী হিসেবে তালাশ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ১৯৭০ সালে প্রথম চলচ্চিত্রকার আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত কাচ কাটা হীরে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। তাঁর সুরকৃত প্রথম জনপ্রিয় গান স্লোগান ছায়াছবির “তবলার তেড়ে কেটে তাক”। এরপর ১৯৭৭ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর পরিচালিত সারেং বৌ চলচ্চিত্রের গান নিয়ে কথা বলার সময় তার ১৯৬৯ সালের সুর করা একটি মুখরা শুনালে ছবির পরিচালক তা নিতে আগ্রহী হন। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই ছবির আবদুল জব্বারের কণ্ঠে “ওরে নীল দরিয়া” গানটি তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি। ১৯৮২ সালে রজনীগন্ধা চলচ্চিত্রে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া “আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত” ও বড় ভালো লোক ছিল চলচ্চিত্রের সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে “হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস” দর্শকদের মনোযোগ কাড়ে। বড় ভালো লোক ছিল চলচ্চিত্রের জন্য অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে তাঁর সুর করা তিন কন্যা চলচ্চিত্রের “তিন কন্যা এক ছবি” গান দিয়ে প্লেব্যাক শুরু করেন কলকাতার নামকরা সঙ্গীতশিল্পী কুমার শানু। নাগ পূর্ণিমা চলচ্চিত্রের এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া রক ধাঁচের “তুমি যেখানে আমি সেখানে”, ভেজা চোখ চলচ্চিত্রের এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে “জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প”
‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘চাঁদের সাথে দেব না’, গানগুলো শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে। আলম খানের সুর ও সংগীত পরিচালনায় সৃষ্ট অসংখ্য গানের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য গান গুলোর মধ্য রয়েছে ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘হীরামতি হীরামতি ও হীরামতি’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’, ‘বুকে আছে মন’, ‘ সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু’, ‘আজকে না হয় ভালোবাসো আর কোনোদিন নয়’, ‘তেল গেলে ফুরাইয়া’, ‘আমি তোমার বধূ তুমি আমার স্বামী’, ‘মনে বড় আশা ছিল’, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়’, ‘ও সাথীরে যেও না কখনো দূরে’, ‘কাল তো ছিলাম ভালো’, ‘ওরে ও জান আমারই জান’, ভালোবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া’ ইত্যাদি।

অন্যদিকে মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রের গুণী অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদকে বনানীতে স্বামীর দাফন করা হয়েছে বলে জানা যায়।
মৃত্যুকালে শর্মিলী আহমেদের বসয় হয়েছিলো ৭৫ বছর। শর্মিলী আহমেদের প্রকৃত নাম মাজেদা মল্লিক। এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী অভিনয় শুরু করেন মাত্র চার বছর বয়স থেকে। রাজশাহী বেতারের শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে চলচিত্রাঙ্গণে হারিয়েছেন একজন অভিভাবক।

ষাটের দশকে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নাম লেখান শর্মিলী। এর মধ্যে উর্দু ভাষায় নির্মিত
প্রথম চলচ্চিত্র ‘ঠিকানা’ আলোর মুখ না দেখলেও পরবর্তীতে সুভাষ দত্তের ‘আলিঙ্গন’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ এবং ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্র দিয়ে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন প্রয়াত অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদ। তাঁর স্বামী রকিবউদ্দিন আহমেদও ছিলেন পরিচালক। তাঁর নির্মিত ‘পলাতক’ ছবিতে অভিনয় করেছেন শর্মিলী আহমেদ। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে আরও কিছু উর্দু ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। স্বাধীনতার পর ‘রূপালী সৈকতে’, ‘আগুন’, ‘দহন’-এর মতো জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল অসাধারণ।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.