গাফিলতির প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৪৫ আহত ৫ শতাধিক গঠন হয়েছে তদন্ত কমিটি


নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, অগ্নিকান্ডে বিস্ফোরণের ঘটনায় তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ হলে সে যতই শক্তিশালী হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবার (৬ জুন) দুপুর পৌনে তিনটায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে স্মার্ট গ্রুপের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
অবহেলা থাকলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এর আগে দুপুর ২ টায় সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপো পরিদর্শন করেন। এসময় সেনা, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

এদিকে রোববার ৬ জুন ৯ ফায়ার কর্মীসহ ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় , গুরুতর আহত ও দ্বগ্ধ হয়েছে প্রায় ৫ শতাধিক। এর মধ্য গুরুতর আহত ৯ জনকে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় নেয়া হয়েছে। দগ্ধ ও আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ সরকারি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে হতাহতদের এক নজর দেখতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ হয়ে উঠেছে ভারী। চারদিকে চলছে স্বজনদের আহাজারি ও শোকের মাতম। বিস্ফোরণের খবর শুনে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে ছুটে যান শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আশরাফ উদ্দিন, পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ আনোয়ার হোসেন, সেনাবাহিনীর ১২ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আলম, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার এস.এম রশিদুল হক ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা।

ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে এ ধরণের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য জেলা প্রশাসনের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মোঃ বদিউল আলমকে আহবায়ক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে আগামী ৭ দিনের মধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার তদস্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এদিকে আহত ও দ্বগ্ধদের সুচিকিৎসায় সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের সর্বস্তরের চিকিৎসকদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর ও জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন জানান , ঘটনাস্থল থেকে রাসায়নিক ও সাধারণ কনটেইনার আলাদা করার চেষ্টা চলছে। আর যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রায় ২’শ জনবল এখানে কাজ করছে।
রাসায়নিক পদার্থ যেগুলো বের হয়ে গেছে, তা বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো রাসায়নিক যেন সাগরে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য সেনাবাহিনীর একটি দক্ষ দল কাজ করছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দিতে আরো সময় লাগবে বলে জানান
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার ৪ জুন রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে স্মার্ট গ্রুপের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
অগ্নিকান্ডের সময় ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিক ভর্তি ড্রাম থাকায় এ ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে প্রথমে সীতাকুণ্ড ও কুমিরা থেকে ২টি পরে একে একে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। এরপর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর ও কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট বেড়ে ২৫টিতে দাঁড়ায়। এসময় ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের প্রায় ২’শ কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার এক পর্যায়ে কেমিক্যাল কন্টেইনারে বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা। ভেঙে পড়ে আশপাশের ঘরবাড়ির জানালার কাঁচ। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচ ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আগুনে দগ্ধ কয়েকজনকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া গুরুতর আহতদের ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, বার্ন ইউনিটে ৫২ জন এবং অর্থোপেডিক বিভাগে ১৫ জন ভর্তি রয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই শ্বাসনালী পোড়া। তাদের বাঁচাতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এদিকে বাংলাদেশ গাউসিয়া কমিটি, রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক টিমের কয়েক হাজার সদস্য ডিপো ও চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন যে মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো বীভৎস। চেনার উপায় নেই। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান চকবাজার জোনের সহকারী (এসি) কমিশনার শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাঁচলাইশ থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) মর্গে পাঠাচ্ছে। সেখানে মরদেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ সংগ্রহ করা হবে। যাদের স্বজন নিখোঁজ রয়েছেন তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় রোববার ৫ জুন রাতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার) বদিউল আলমকে কমিটির প্রধান করে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা পুলিশ, বিস্ফোরক অধিদফতর, শিল্প ও কারখানা অধিদফতর, বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে রেখে ৭ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান। এসময় তিনি বলেন, এ কমিটি প্রতিটি সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেহেতু বেশি সময় আরও বেশি লাগতে পারে বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান।

অন্যদিকে রোববার ৫ জুন বিএম
কনটেইনার ডিপো মালিকের পক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো লিখিতি এক বিবৃতিতে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেবে বলে ঘোষণা দেন বিএম ডিপোর জিএম মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। বিবৃতিতে বলা হয়, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে, গুরুতর আহত বা অঙ্গহানির শিকার প্রত্যেকেকে ৬ লাখ টাকা করে, এবং বাকি আহতদের ৪ লাখ টাকা করে মালিকের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। এতে আরও বলা হয়, আহতদের রক্ত দিতে স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি প্রায় ৫০০ জনকে কোম্পানির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২৮০ জন স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে রোগীদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আহতদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ কোম্পানির পক্ষ থেকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে। অগ্নিদুর্ঘটনায় কর্মচারী নিহত হলে তাদের পরিবারে শিশু থাকলে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত বেতনের সমপরিমাণ টাকা প্রদান এবং উপার্জনক্ষম সদস্য থাকলে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে বলে বিবৃতিতে ঘোষণা দেন।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.