কর্ণফুলীতে এনজিও গুলো শুরু করেছে ঋণের কিস্তি আদায়ের চাপ!

দেখা মিলেনি ত্রাণ বিতরণে


জে.জাহেদ, সিনিয়র রিপোর্টার:

পুরো বিশ্বে পড়েছে করোনার প্রভাব। তবুও কমছে না ক্ষুদ্রঋণে কিস্তির চাপ। করোনা পরিস্থিতির কারণে সারাদেশে এনজিও ঋণের কিস্তির ৬ মাসের জন্য শিথিল করেছে ক্ষুদ্রঋণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। কিন্তু এই নির্দেশনা কার্যকারিতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না কর্ণফুলীতে।

উপজেলায় বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারি ও অন্যান্য এনজিওগুলো যেমন-ব্রাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, উদ্দীপন, পদক্ষেপ, নিষ্কৃতি, কোডেক, টিএমএসএস, প্রতিশ্রুতি, সমতা, সুকণ্যা, বির্ডস, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মমতা, সূর্যের হাসি ক্লিনিক, অন্তর, এসএস, বিজ, ফ্রাদার ফ্লেভিয়ান ট্রে: স্কুল ইত্যাদি সংস্থাগুলো তাদের ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায়ে চাপ শুরু করে দিয়েছে।

এনজিওগুলো তাদের সাপ্তাহিক ও মাসিক ঋণ (কিস্তি) আদায় চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এতে বিপাকে পড়েছে উপজেলার নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষেরা। লকডাউনে যেখানে তিন বেলা খাবারের রসদ যোগাচ্ছে সমস্যায়, সেখানে কিস্তি আদায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অথচ এসব এনজিওদের এমআরএ নির্দেশনা প্রদান করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠির মাঝে জরুরী খাদ্য বিতরণ করার। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কর্ণফুলীতে ছোট বড় ২১টি এনজিও’র কাউকেই জরুরী খাদ্য সহায়তা দিতে কিংবা উপজেলা প্রশাসনকে তাদের খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। অথচ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো এনজিও ও সুদ কারবারিরা কিস্তির জন্য চাপ দেওয়া শুরু করেছে। অনেকে করোনাকালীন সময় উপক্ষো করে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের আবার অফিসকে ডাকছেন।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি কতৃক ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি শিথিল করার সার্কুলার

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) বলেছেন, আগামী জুন পর্যন্ত ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেটিকে খেলাপি বলে শ্রেণীকরণ করা যাবে না। কিন্তু এই দুঃসময়েও উপজেলার হতদরিদ্রদের কিস্তির বোঝা কমছে না। উদ্দীপন এনজিও থেকে ঋণগ্রহীতা উপজেলার নাজমা আক্তার বলেন, ‘অফিস থেকে কল করে কিস্তি আদায়ে চাপ দিচ্ছেন। এমনকি করোনা সঙ্কটকালীন এমন পরিস্থিতিতে বারংবার অফিসে যেতে তাগিদ দিচ্ছেন।’ একই কথা জানালেন আরেক এনজিও থেকে ঋণগ্রহীতা দোকানদার মো. শাহাজাহান। এ বিষয়ে অনেকে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।

করোনা পরিস্থিতিতে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধের পথে, দুঘন্টা করে চলছে ব্যাংক, এরইমাঝে এনজিও ও সুদ কারবারিদের কিস্তি আদায়ে চাপ কতটা যুক্তিসঙ্গত; প্রশ্ন থাকে। কেনোনা করোনা প্রভাবে মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য মন্দ। সাধারণ মানুষ দিশেহারা। আতঙ্কে মানুষ পাড়া মহল্লায় বের হতে চায় না। সাধারণ মানুষও আগের মতো চলাফেরা করে না। এনজিও’র ঋণের জালে জড়িত মানুষেরা এসময় বিপাকে। এমনকি ঋণ নিয়ে নিজেদের ভাগ্যবদল চেষ্টাকারী ব্যক্তিরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিস্তি তোলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কর্ণফুলীতে অবস্থিত ‘উদ্দীপন এনজিও’র ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন মঙ্গলবারও ২৫ হাজার টাকা আদায় হওয়ায় সত্যতা জানিয়ে বলেন, ‘সীমিত পরিসরে অফিস খোলা হয়েছে। কাউকে কিস্তি আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে না। তবে যারা স্বইচ্ছায় কিস্তি দিচ্ছেন তা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও আমরা উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করছি খাদ্য সহায়তা দেওয়ায়।’

নিষ্কৃতি এনজিও সংস্থার পাঁচ জন ফিল্ড অফিসার মাঠ ঘুরে মঙ্গলবার ৫/৬ হাজার টাকা কিস্তি তুলেছে স্বীকার করে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সুমন দাশ বলেন, ‘অফিস চালু হয়েছে। গ্রাহকের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। যারা কিস্তি দিচ্ছেন আমরা নিচ্ছি। লকডাউনে মানুষ কষ্টে আছে আমরা জানি। তাদেরও বাঁচতে হবে। আমাদেরও বাঁচতে হবে।’ আশা এনজিও’র ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আজিজুর রহমান জানান, কর্ণফুলীতে তাঁরা ইউএনও সাহেবকে অবগত করে দু’শ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন।’

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির খাদ্য বিতরণে অফিসিয়াল আদেশ

কর্ণফুলী উপজেলা এনজিও ফোরামের সমন্বয়কারী ও সুকণ্যা এনজির মুখপাত্র মো. ওসমান হোসাইন বলেন, ‘সকল এনজিও সরকারী তহবিলে সাধ্যমতো বরাদ্দ দিচ্ছেন। উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে সরকারী, বেসরকারী ও মন্ত্রী মহোদয় কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চলছে। আমরাও পরিকল্পনা নিচ্ছি লকডাউন শেষ হলে দরিদ্রদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করার। উপজেলায় সুষ্ঠু বন্টন অথবা সমন্বয়হীনতার অভাবে হয়তো নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের খাদ্য সহায়তা পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।’

কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘উপজেলায় এনজিও সংস্থাগুলো কোথাও খাদ্য বিতরণ করেছে বলে আমার কাছে তথ্য নেই। যোগাযোগও করেনি কোন এনজিও। তবে ইউএনও সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেছে কিনা সেটা আমি জানি না।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন এর নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না হওয়ায় কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।’

প্রসঙ্গত, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) পর পর তিন সার্কুলার জারি করে জানান, দেশে করোনা সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে জুন পর্যন্ত কোন গ্রাহক যদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে তাদের ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেও ঋণকে নিয়মিত রেখে প্রয়োজনে নতুন ঋণ দিতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

আরো বলা হয়েছে উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে জরুরী খাদ্য বিতরণ করার। সীমিত আকারে এনজিও অফিস চলমান রাখার। এক্ষেত্রে অফিসে উপস্থিত সকলের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব (ডব্লিউএইচও এর গাইড লাইন অনুযায়ী) বজায় রাখতেও বলা হয়েছে।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.