মানবিক পৃথিবীর কাছে হেরে যাক করোনা


মুহাম্মদ সেলিম হক:

করোনাভাইরাস, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯। সেই রোগটিকে এখন বিশ্ব মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনায় শুরুতে দেশের মানুষ তেমন আতঙ্ক ছিল না। হাসি আর তামাশায় চলে প্রতিদিনকার জীবন যাপন।

সরকারি ছুটি কিংবা অঘোষিত লকডাউন ঘোষণার পর থেকে সবাই নড়েচড়ে বসে। সাধারণ ছুটির প্রথম দিন থেকে মাঠ থেকে আওয়াজ আসে ‘ওরা কেমন চলবে’। ত্রাণের জন্য হাহাকার। এরা কারা? এরা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর অতি দারিদ্ররা।

সোশ্যাল মিডিয়াতে চলে দান নিয়ে তর্ক বিতর্ক। গোপনে আর প্রকাশ্যর লড়াই। তুলোধুনা করে একে অপরকে। করোনাকে ছাপিয়ে ত্রাণের পিছনে ছুঁটে চলা অবিরাম মানুষকে নিয়ে ফটোসেশন। কিছু ছবি ছিলো কটু, কিছু ছবি মানবিক। দানের ব্যাপারে বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টান ধর্মের পাতা উল্টিয়ে দেখলাম, দান করা ভালো কাজ। তবে গোপনে আর প্রকাশ্যের বিষয়টা ইসলাম ধর্ম ছাড়া আর কোথাও নেই।

সূরাহ আল-লাইল এ আল্লাহ কুরআনে বলেন, ‘শপথ রাতের যখন তা আধারে ঢেকে যায়। শপথ দিনের যখন তা আলোয় উদ্ভাসিত হয়। শপথ তাঁর নর-নারী সৃষ্টির। তোমাদের চেষ্টাগুলো কতই না ভিন্ন। তবে, যে দান করে এবং আল্লাহকে ভয় পায়, আর ভালো কাজের পরিণামে বিশ্বাস করে, আমি তার জন্য সহজকে পাওয়া সহজ করে দেবো।’

ইসলাম ধর্মে দান প্রকাশ্যে করা হারাম আমি পায়নি। তবে গোপনে করার সওয়াবের কথা কুরআনে আর হাদিসে বেশি উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ হয়তো অভাবগ্রস্থ ব্যক্তিকে লজ্জা থেকে বাঁচাতে এ নিয়ম।

তবে দান কেন, ইসলাম ধর্মে সব ইবাদত লোক দেখানো হারাম। আপনি প্রকাশ্য দান করুন সমস্যা নেই। তবে নিয়ত থাকতে হবে মনে মনে কেবল আল্লাহ সন্তুষ্টি জন্য এ দান। কুরআনের এ আয়াতে আমার তা মনে হলো-যদি তোমরা প্রকাশ্য দান খয়রাত কর, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্থদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের আরও উত্তম। আল্লাহ সব তোমাদের সব কিছু গোনাহ দূর করে দিবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজ কর্মের খুব খবর রাখেন। (সূরা আল বাকারা ২-২৭১ আয়াত)

প্রকাশ্য দানকে নিয়ে অনেকে হেয় করে, এ দৌড়ে এগিয়ে আছেন কৃপনরা। এরা নিজেরা করে না অন্যজনে করলে বলে, লোক দেখানো। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রকাশ্য দানের বড় দরকার। এতে অন্যজন উৎসাহিত হয়। যদি প্রকাশ্য দান হারাম হতো, বদরের যুদ্ধে হযরত আবু সিদ্দিকী (রাঃ) আর হযরত ওমর ফারুকের দানের প্রতিযোগিতা আমরা জানতে পারতাম না।

হাজী মুহাম্মদ মহসিনের দানের কথা গোপন থাকলে কেউ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসতো না । হাতিম তাইয়ের দানের কথা হাজার বছর পরও মানুষ কেমনে জানতো। হযরত ওমর ফারুকের (রাঃ) রাত্রে দানের কথা কিভাবে আজও প্রেরণায় হয়ে থাকতো না।

মসজিদ করার দান বেশির ভাগ প্রকাশ্য হয় জুমাবার। একজনের দানের কথা শুনে অন্য জনের হৃদয় শিহরণ জাগে। তখন মসজিদের থলে ভরে যায়। ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা যায়। আবার হিংসাও করা যায়। যেমন ধরো, একজন যুবক দাড়ি রাখলো, সৎ। নিয়মিত ধর্মের সব কাজ করে। তাকে এক্ষেত্রে হিংসা করলে গুনা হবে? তার মতো আমি হতে চাই।

যেন দান করে, সে গোপনে করেও প্রকাশ্য ও করে। আল্লাহ তালার দুটো সুযোগ সে গ্রহণ করেন। দানের মাঝে এক ধরণের মানসিক শান্তি আছে। এটা কেবল দানীরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, যাহা ভাষা প্রকাশ করা যায় না।

বাংলাদেশে সিডর কি আইলা নামে ঘূর্ণিঝড়ে ইসলামী বাংকের মাধ্যমে এক ব্যক্তি এক হাজার কোটি টাকা গোপনে দান করে দূর্গত এলাকার জন্য। দশ বছর পর জানা গেলো, সে ব্যক্তির নাম। তিনি ছিলেন সৌদি আরবের বাদশা আবদুল্লাহ। এ পৃথিবীর বুকে বিলগেটস, ওয়েন বাপেট ওয়ে, ভারতের আজিম হাশিম প্রেমজী, সৌদি আরবের প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালালের দানের পরিমানের কথা শুনলে চোখ কপালে উঠে।

আজ পৃথিবীর বুকে এক সাথে আঘাত না আসলে, এদের দানের ভারে দেশ নুয়ে পড়তো। যে দান করে না, সে কোনটিই করে না। কেবল সমালোচনা। অনেকের অনেক সম্পদ রয়েছে, ইচ্ছা করলে দান করতে পারেন না। কারণ সে কৃপন। দানের সময় তার বুক কাঁপে। হাদিসে আছে- কৃপনের জন্য জাহান্নাম খুবই কাছে আর দানীর জন্য জান্নাত খুবই নিকটবর্তী।।

করোনা একটা যুদ্ধে। এ যুদ্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কেবল সরকার একা পারবে না। সময় কেন জানি বলছে করোনার চেয়ে খাদ্য সংকট ভয়াবহ হবে। এ যুদ্ধের দানের প্রতিযোগিতা হউক ধনীদের মাঝে। হউক প্রকাশ্য দান। সাথে গোপনে। মানবিক পৃথিবীর কাছে হেরে যাবে করোনার তান্ডব। সারকথা: দান গোপন আর প্রকাশ্য যা হউক
কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি!!

মুহাম্মদ সেলিম হক
সাংবাদিক ও সমসাময়িক লেখক
কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।
১৪ এপ্রিল ২০২০

নোট: মতামতের দায়-দায়িত্ব লেখকের একান্ত নিজস্ব।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.