ইদূঁরের উপদ্রব আবারও ফারুয়া ইউনিয়নে দেখা মিলেছে, ব্যাপক ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি


চিরন বিকাশ দেওয়ান, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি: পূর্বেও ২০১০ সালে জুরা ছড়ি বাঘাইছড়ি বিলাই ছড়িতে দেখেছি,এবার নতুন করে ৩ নং ফারুয়া ইউনিয়নে আগাম রূপবান শিম (লতাজাতীয়গাছ), বাদাম এবং অন্যান্য ফসলে ইদূঁরের উপদ্রবে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে হতাশ চাষিরা।

এই সব বিষয়ে সরেজমিনে দেখতে গেলে- এগুজ্যাছড়ি ও গোয়াঈনছড়ির চন্দ্র, পুলক, গলাক্যা, সুব্রত ও চন্দ লাল তঞ্চঙ্গ্যা নামে বেশ কয়েক জন কৃষক জানান, তাদের জমিতে বা ফসলি মাঠে বিশেষ করে রাতের আধারে মাটির ভিতরে শেকড় ও গড়ার অংশ ফলন পরিপক্ব হবার আগে ইদূঁরেরা নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি প্রথমে দেখা যায় না। পরে আস্তে আস্তে মরে যায় লতাজাতীয় এই শিম গাছ এবং একইভাবে হাস্যা বা ডাল জাতীয় শিম ( ফরাগ শিম) এবং সাধারণ ও অন্যান্য ফসল, সবজিতেও। বাদামগুলো এমনিতেই খেয়ে ফেলছে, গোড়া থেকে মরে যাচ্ছে বলে জানা ও দেখা গেছে। এক একটা ইদূঁর আধা কেজির উপরে। তাছাড়া রয়েছে রোগবালাইও।

অন্যদিকে তক্তানলার আনন্দ মেম্বার, ভরত চন্দ্র, উলুছড়ির বদা এবং চাইন্দা পাড়ার নির্মল তঞ্চঙ্গ্যা সঙ্গে সরাসরি কথা হলে তারা জানান, এ অঞ্চলে লাল শিমের চাহিদা বেশি তাই ব্যাপকভাবে প্রতিবছর লাল শিম চাষ করে থাকি।যা প্রতিবছর বাম্পার ফলন হয়। এবছরে এযাবৎ অনেক ফলন বা শস্য হলেও বেশির ভাগ ক্ষতি করেছে ইদূঁরেররা। এখনো সোনার ফসল তুলতে অনেক সময় বাকি। আরো ক্ষতি করবে। প্রতিবছর অনেকে আমরা আড়াই তিন লক্ষ টাকা পেলেও এ বছরে ১ লক্ষ টাকাও পাবোনা না বলেও আশা রাখছিনা।

তারা আরো জানান, ফসলি মাঠে অসংখ্য ইদূঁরের গর্ত রয়েছে। যা এলাকায় ভেদে ইদূঁরের উপদ্রব বেশি। দিনের বেলা দেখা যায় না, রাতেও কম দেখা যায়। কান পেতে শুনলে শোনা যায়। তারা আরো জানান, অনুমানিক মূল জমির প্রায় শিমের ৩০-৩৫ ভাগ বা এর কাছাকাছি জমির ফসস নষ্ট করেছে। খুব বড় ধরনের ইদূঁর। আর বাদামের বেলায় ৭০ ভাগেরও বেশি ক্ষতি করেছে বলে জানা গেছে। গর্তের ভিতরে শুধু বাদাম আর বাদাম।

কৃষক বা চাষীরা আরো জানান, তারা কোনো সহযোগিতা ছাড়া নিজ উদ্যোগে বীজ ক্রয় করে বপন বা রোপণ করে ফসল বুনেছে নিজ জমিতে, অনেকে বর্গা হিসেবেও। এতে লাভের আশা তো বাদ, নিশ্চিত লোকসান। এতে বেশ হতাশায় রয়েছেন। আশানুরূপ ফলন তো পাবেন না মূল পূঁজিও উঠবে না তাদের। বিশেষ করে ইদূঁরেরা ক্ষতি করছে এগুজ্জ্যা ছড়ি, তাড়াছড়ি, ওড়াছড়ি তক্তনালা ও চাইন্দ্যা ও রোয়াপাড়া ছড়া ও আলেখ্যং এলাকায়।

ভুক্তভোগীদের এবিষয়ে কৃষি অফিসকে অবগত করা হয়েছে কি-না আরো জানতে চাইলে তারা জানান, আসেনা বলে কাকে জানাবো এমনতাই জানান তারা। অথচ এ সময়ে সবসময় পাশে থেকে আমাদের সৎ পরামর্শ ও সহযোগিতা করা দরকার।

এই বিষয়ে ৩ নং ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা’র সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, ফারুয়ার বেশির ভাগ মানুষ বাদাম ও শিম চাষের উপর নির্ভরশীল। একমাত্র আয়ের উৎস ও বলা যায়। এবছরে হঠাৎ ইদূঁরের আক্রমণে ফারুয়া ইউনিয়নে ফসলি জমিতে বিশেষ করে বাদাম ও শিমের ব্যাপক ক্ষয় – ক্ষতি করছে। যা বলার মত নয়। কৃষি অফিসাররা মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়। ইদূঁর দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার মতো এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে শুনি নাই।

এই বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার শাহদাত হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, ফারুয়া ইউনিয়নে আমাদের স্টাফ তক্তা নালায় আবুবকর, ফারুয়া সদরে হানিফ ও তাড়াছড়ি এলাকায় এটিএম শামসুজ্জামান নিয়মিত দেখাশুনা করার দায়িত্বে রয়েছে। ইঁদুর নিধনের জন্য কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত চলমান ব্যবস্থাও রয়েছে। এলাকটি দূর্গমতার কারণে আসা- যাওয়ার জন্য হয়তো একটু এদিক সেদিক হবে। তাছাড়া বেশি ইদূঁর হলে সবগুলো মেরে ফেলা কঠিন। কারণ এখানে বড় বড় জঙ্গল ও পাহাড় রয়েছে। এক- একটি ইদুঁর প্রায় ১ বারে ৮-১০ টি বাচ্চা দেয় ২১- ২৮ দিন অন্তর যা বছরে প্রায় ৮৮০ টি বাচ্চা দেয়। তাছাড়া নিয়ন্ত্রণে জন্য জমি সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।

এছাড়াও ইদূঁর মারার জন্য ঔষুধ ল্যানিরেট, রেনির‍্যাট, র‍্যাটোনিলব ও ফসটকসিন নামক গ্যাস রয়েছে। বিকল্প হিসেবে গর্তে পানি দুকালে ইদুঁর বের হয়ে আসে যা অপেক্ষা করলে তীর ও লাঠি দিয়ে মারতে পারবেন। ফাঁদ হিসেবে ইদুঁর মারার কল ব্যবহার করা যেতে পারে এবং রয়েছে আরো ফ্লাড সেচ ব্যবস্থা যা পুরো জমি পানি দিয়ে ডুবালে বা ভিজালে গর্তের ভিতরে ইদূঁরেরা অন্যত্র চলে যায়। ফসটকসিন গ্যাস গর্তের ভিতরে ডুকিয়ে গর্ত বন্ধ করে দিলে সময়ের ভিতরে গ্যাসের গন্ধে মারা যায়। এছাড়াও ইদুঁর খেকো প্রানী বিড়াল, সাপ, পেশা ও গুইসাপ জমিতে ছেড়ে দেওয়া।

কৃষি বিভাগ সূত্রে আরো জানা যায়, এ বছরে ৬৩ হেক্টর জমিতে শিম ও ৬০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। ইঁদুর নিধন অভিযান একসভায় জনপ্রতিনিধিসহ কৃষকদের কৃষি অফিস হতে ২০০ জনেরও অধিক জনে নভেম্বরের দিকে আগাম ইঁদূর মারার ঔষধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন জাতের বীজ ও সার।

তারা আরো জানান, বড় পুরুষ ইদূঁরের পায়ুপথ সুঁই দিয়ে সেলাই করে দিলে এরা পায়খানা করতে পারে না। ফলে যন্ত্রণায় পাগলের মত আচরণ করে অন্য ইদূঁরগুলো কমড় দেয়। যার ফলে বাকি ইদূঁরগুলো ভয়ে পালিয়ে যায় বলেও কৃষি বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এছাড়াও জিঙ্ক ফসফাইড হল এক ধরনের রডেন্টিসাইড অর্থাৎ ইদুঁর জাতীয় প্রাণী মারার জন্য রাসায়নিক। ইদূঁরের দেহে পাচনতন্ত্রের এসিড। এই ফসফাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে বিষাক্ত ফসফিন গ্যাস। যা তাদের মৃত্যু ডেকে আনে।

প্রতিবছর সারাদেশের ন্যায় আগাম এই শীতকালীন শিম চাষ করে কেজিতে ১০০-১২০ টাকা যা প্রতিমণ ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা বিক্রয় করে থাকে। যা এলাকার মানুষের পারিবারিক পুষ্টির চাহিদার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হলেও এবছর টা হয়েছে উল্টো একমাত্র ইদূঁরের উপদ্রবের কারণে। লাভের আশা তো বাদ, ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই এই কৃষকদের সরকারের বিশেষ সহায়তা এবং প্রয়োজন কর্তৃপক্ষে সুদৃষ্টি।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.