করোনা ও মানবিক পুলিশ


সাঈদ আহসান খালিদ:

বিরাজমান করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশ পুলিশের বহুমুখী মানবিক ভূমিকা মুগ্ধতা জাগানিয়া, বিস্ময়কর এবং অনুপ্রেরণাদায়ী৷ নানা কারনে নেতিবাচক খবরের বিষয়বস্তু হওয়ায় জনমানসে পুলিশ সম্পর্কিত যে ভীতিপ্রদ ভাবমূর্তি ছিল- সেটি এই করোনাকালে তুমুল বদলে গেল- ‘মানবিক পুলিশ’ এর বিচিত্র ও চমৎকার সব কার্যক্রমে।

রাষ্ট্রের সব বাহিনীর মধ্যে পুলিশের অবস্থানই সবচেয়ে নিবিড় জনসংশ্লিষ্ট। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, মামলা তদন্ত থেকে শুরু করে ভিআইপি প্রটোকল- এমন কোন কাজ নেই- যেখানে পুলিশকে সংযুক্ত হতে হয় না। রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনে শারীরিক ও মানসিক শ্রমে পুলিশের নিবেদন সর্বোচ্চ। অথচ সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইনের কাঠামো থেকে পুলিশের আজো মুক্তি মেলেনি, প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি, প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা, মর্যাদা ও সম্মান পুলিশ পায়নি। সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বর্তমান করোনাকালে দেশব্যাপী পুলিশের বিপুল মানবিক তৎপরতা, নিরন্তর পরিশ্রম ও পরম আত্মনিবেদন- সমীহ জাগায়।

ফেইসবুকে শেযার করা লেখকের স্ট্যাটাস

নিজের জীবন কিংবা পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা যখন ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ এ নিশ্চিন্ত, তখন এইসব পুলিশ সদস্যরা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন পথে-ঘাটে আইন- শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রাস্তায় জীবানুনাশক ছিটানো, কোয়ারেন্টাইনে বন্দি বাসিন্দাদের ঘরে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার পৌঁছে দেওয়া, হতদরিদ্রদের কাছে বিনামূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের কর্মস্থলে আসা যাওয়ার জন্য পরিবহন সুবিধা দেওয়া- কী বিচিত্র সব কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত আমাদের পুলিশ!

এই করোনা আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিচ্ছে। বিস্ময়ে দেখছি- করোনার ভয়ে স্বামী-স্ত্রীকে, স্ত্রী- স্বামীকে, সন্তান তার পিতা-মাতাকে পরিত্যাগ করছে, অসুস্থ প্রতিবেশীকে কেউ হাসপাতালে নিচ্ছে না, করোনায় মৃত লাশের দাফনে স্বজনের দেখা মিলছে না অথচ এই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাই জীবন বাজি রেখে অসুস্থকে হাসপাতালে নিচ্ছেন, মৃত ব্যক্তির দাফন কাফনসহ জানাজা সম্পন্ন করে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করছেন। এতে অনেক পুলিশ সদস্য ইতোমধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ কোথাও পিপিই-র দাবিতে তাঁর দায়িত্ব পালনে বিরত থাকছে বা গড়িমসি করছে- এমন দৃষ্টান্ত দেখিনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ২০ কোটি টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছে পুলিশ। ২০ কোটি টাকার অনুদানের অর্থের মধ্যে রয়েছে পুলিশ কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের একদিনের বেতন, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, পুলিশ অফিসার্স মেস ও পুলিশ কল্যাণ তহবিলের অর্থ। সরকারের কাছে নিজেদের জন্য কোন প্রণোদনা বা আর্থিক সাহায্যের গ্রহীতা হওয়ার বদলে সাহায্য-দাতা হিসেবে পুলিশের এই অগ্রণী ভূমিকা- আমাদের সবার জন্য শিক্ষণীয়।

আমার ফেসবুক বন্ধুতালিকায় পুলিশ সার্ভিসের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত অনেক প্রিয়ভাজন বড়ভাই, বন্ধু, স্নেহের অনুজ ও শিক্ষার্থীরা রয়েছে। করোনা মোকাবেলায় তাদের মানব-দরদি নানা কর্মকাণ্ড, অমানুষিক শ্রম ও জাতির সেবায় আত্ম-নিবেদন আমাকে আপ্লুত করে। আশা করি করোনা পরবর্তী পৃথিবীতেও এই মানবিক পুলিশিং অব্যাহত থাকবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ সবার হেফাজত করুন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অাইন বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.