কর্ণফুলীতে করোনা ঠেকাতে কি করা যায়, বলছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ
জে.জাহেদ, সিনিয়র রিপোর্টার:
কোভিড-১৯ যা করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত। শ্বাসনালীতে বাসা তৈরি করে আক্রমণ করা এই করোনা থাবায় মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়েছে পুরোবিশ্ব। চীন, ইতালি, কানাডা, স্পেন ও আমেরিকায় একেক দিনে টপকে যাচ্ছে দৈনিক মৃত্যুর হিসাব। কোনো ভাবেই থামানো যাচ্ছে না। ভয়ঙ্কর করোনা ভাইরাসে প্রবলভাবে বিধ্বস্ত পুরো বিশ্ব। স্তব্ধ ২০৮টি’র ও অধিক রাষ্ট্র। বিশ্বের ৭৫০কোটি মানুষ আজ অবাক।
করোনা আতঙ্কে দানা বেঁধেছে দেশের মানুষের মনেও। সারা বিশ্বে যেমন লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা। তেমনই বাংলাদেশেও প্রতিদিন বহু মানুষের শরীরে মিলছে করোনা সংক্রমণ। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামেও ৭ জনে ছড়িয়েছে। যার ফলে খেয়েপরে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষ গুলো বিপাকে। করোনা নিয়ে বিজ্ঞানীরাও মানুষকে আশার আলো দেখাতে পারছেন না।
করোনা মোকাবেলায় এই মুর্হুতে একটাই উপায়। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে ঘরে থাকায় নিরাপদ। সাধারণ মানুষকে এই কথাটি বুঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরকার। অভিযানে নেমেছে দেশে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উইং। বিদ্যমান এমন পরিস্থিতিতে কর্ণফুলী উপজেলাও অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে। কেনোনা এই উপজেলায় রয়েছে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)সহ ছোটবড় ৪৩টি মিল-কারখানা ও গার্মেন্টস।
দামপাড়ার ঘটনার পর ৮এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকা, হালিশহর ও সীতাকুন্ড উপজেলায় ৩ জনের শরীরে করোনা সনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে একজন গার্মেন্টস কর্মী। আক্রান্তদের মধ্যে আবার বিদেশ প্রত্যাগতদের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস নেই। তাহলে ধারণা করা হচ্ছে, এরা মূলত সামাজিকভাবে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন।
অন্যদিকে দামপাড়ায় প্রথম করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসায় বেসরকারী হাসপাতালের ল্যাবে কাজ করা কর্ণফুলী উপজেলার ৩ ব্যক্তি আইসোলেশনে এবং তাদের পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিদের্শ দিয়েছে প্রশাসন।
এই মুহূর্তে কর্ণফুলীর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজন কি ভাবছে, উপজেলা প্রশাসন আরো কি কি পদক্ষেপ নিলে সাধারণ মানুষ সুরক্ষিত থাকতে পারবে, হতদরিদ্র সাধারণ মানুষকে আরো কিভাবে নিরাপদ ও সচেতন রাখা যায়, করোনা মোকাবেলায় এই মুর্হুতে সাধারণ মানুষের মনে কি কি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেই অনুযায়ী কি ব্যবস্থা নিলে আরো ভালো হয়। এনিয়ে কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত জানতে চট্টগ্রাম নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার জে.জাহেদ ‘অনলাইন’ এ মুখোমুখি হয়েছিলেন। আসুন এবার জেনে আসি কে কি বলছে…

মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ( অধ্যক্ষ, কর্ণফুলী এ জে চৌধুরী কলেজ): কোন অবস্থাতেই ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় দরিদ্রদের তালিকা তৈরী করে তাঁদের ঘরেই খাবার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারী সাহায্য ছাড়া সম্পদশালী ব্যক্তিদের সাহায্য দেওয়ার সময়ও প্রশাসনকে অবহিত করে প্রদান করা দরকার। যাতে একই ব্যক্তি বার বার খাদ্য সামগ্রী না পায়।
মোহাম্মদ দিদারুল আলম (জনপ্রতিনিধি-স্থানীয় ২নং বড়উঠান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান): আমি মনে করি এই মুহুর্তে কর্ণফুলী উপজেলার সন্দেহজনক ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে জরুরী ভিত্তিতে করোনা ভাইরাস কোভিট-১৯ এ আক্রান্ত কিনা তা টেস্ট করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা।
মুহাম্মদ সেলিম হক (রাজনীতিবিদ ও সমসাময়িক কলাম লেখক): আমি মনে করি কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের উপর কড়া নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখা ও পাড়ায় পাড়ায় সচেনতার জন্য জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগাতে হবে। আপাতত বহিরাগত লোকদের ব্যাপারে কড়া নজর রাখতে হবে। কারণ কর্ণফুলীতে এখন কেউ সংক্রমণ হয়নি। হলেও এটা বাহির থেকে এসে কেউ ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসআই আলমগীর হোসেন (উপজেলায় কর্মরত সরকারি পুলিশ অফিসার): কর্ণফুলী থানাধীন সবচেয়ে জনবহুল এলাকা শিকলবাহা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে বলতেছি, এই পরিস্থিতিতে সন্দেহ হলেই করোনা টেস্ট এর ব্যবস্থা করতে হবে।
আনোয়ার হোসেন (আইনজীবি-চট্টগ্রাম আদালত): বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলায় দায়িত্বরত পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। কর্ণফুলী থানার অর্ন্তগত এমন কিছু মানুষ বাস করে যাদের বার বার সুন্দর ব্যবহার করে ঘরে থাকার পরামর্শ প্রধান করা হলেও তারা এসব অনুসরণ করছে না। পুরাতন ব্রীজঘাটসহ কর্ণফুলী থানাধীন সকল বাজার, ছোট রাস্তা এবং অলিগলিতে অপ্রয়োজনীয় অড্ডা বন্ধ করতে পারলে কর্ণফুলীবাসী রক্ষা পেতে পারে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিনিধিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইঞ্জিনিয়ার হারুনুর রশিদ (বেসরকারী চাকরিজীবি): কোভিড-১৯ এর বেশী বেশী পরীক্ষা করার কোন বিকল্প নেই। এর জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়ীর বাইরে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। লকডাউনে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে, বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ‘দিনে এনে দিনে খায়’ এমন লোকদের বাড়িতে খাদ্য সরবরাহ নিয়মিত করতে হবে।
হাসান মুরাদ সাগর (ডিপ্লোমাধারী পল্লী চিকিৎসক): করোনা ভাইরাসটা যেহেতু মারাত্মক ছোঁয়াচে। আক্রান্তদের কেউ হেঁটে গেলে বা কোন কিছু স্পর্শ করে গেলেই অপরজন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। সেক্ষেত্রে দরকারী কাজ ছাড়া বাহির না হওয়া এবং ঘরে থাকা দরকার। জনগণ সচেতন হলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কম হবে। আমরা যদি লকডাউন মেনে চলি এবং বাজারটা নিয়ন্ত্রণে রাখি তাহলে ভালো ফল দেবে আশা করছি।
মো. ওসমান হোসাইন (এনজিও ফোরামের সমন্বয়কারী ও তরুণ উদ্যোক্তা): স্থানীয় বাজার ও মার্কেট গুলোতে আরো নজরদারি বাড়ানো। প্রশাসন ব্যতিত যে সব এলাকায় স্বেচ্ছায় লকডাউন করেছে। প্রশাসন সে সব তদারকি করে যোগাযোগ প্রশস্ত করে দেওয়া। কেননা সামনের রাস্তায় বাশঁ দিয়ে লকডাউন করে ভিতরে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও প্রান্তিক এলাকায় পুলিশ মনিটরিং কম থাকায় এক শ্রেণির মানুষ চায়ের দোকানে আড্ডা, মুদির দোকান সার্বক্ষনিক খোলা রাখছেন।
মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ পাটোয়ারী (ক্রীড়া সংগঠক): প্রতিদিন মাইকিং ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালালে ভালো হত। বিশেষ করে নিজ নিজ ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিদের একটু কঠিন হতে হবে। যদিও করোনা মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের নানা পদক্ষেপ ও উদ্যোগ প্রসংশনীয়।
আবদুল মালেক রানা (ঠিকাদার ও তরুণ ব্যবসায়ি): প্রথমত, পুরো উপজেলায় লকডাউন বলতে যাহা বুঝায় তাহা বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি এবং বেসরকারি ত্রাণ একত্রে করে প্রশাসনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, করোনাভাইরাস এর উপসর্গগুলো কি কি এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে এবং কোথায় কিভাবে করোনা পরীক্ষা করতে হয় সেই বিষয়ে জনগণকে জানাতে হবে।
এম. মনির উদ্দীন (সমাজ সচেতন ব্যক্তি): কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। এমনকি পুরো উপজেলাকে প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত লকডাউনে নিয়ে আসা যায় কিনা। এমন ব্যবস্থা গ্রহণে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সাজ্জাদ সাজিদ (উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক): এ মূহুর্তে কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে, জনগণকে সচেতন হতে হবে।
আকাশ চৌধুরী (সিপ্লাস টিভির সংবাদকর্মী): উপজেলা প্রশাসন ভালো ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তারপরেও কিছু জায়গাতে আরেকটু কঠোর হওয়া দরকার। যেমন-গ্রামের অলি গলিতে ছেলেদের আড্ডা, হাট বাজার, চায়ের দোকান। সবচেয়ে বড় কথা ফকিরনীরহাট বাজারের চিত্র ভয়াবহ। দেখা গেছে সেখানকার লোকেরা সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, দেশে যে মহামারি চলছে সেটাও ভুলে গেছেন।
মোস্তাক আহমেদ মুন্না (শিক্ষার্থী): নৌপথে এখনো অনেক মানুষ শহরে প্রবেশ করছে এটা বন্ধ করা দরকার। অযথা বিভিন্ন বয়সের মানুষ অলিগলিতে, মোড়ে আড্ডা দিচ্ছে। খেলার মাঠে বিকালে অনেক কিশোর-যুবক খেলা করছে।
মো. আবদুস সালাম (তরকারী বিক্রেতা-ব্রিজঘাট কাঁচা বাজার): আমরা ছোট মানুষ আমাদের কথা কি কেউ শুনবে। আমার মতে কর্ণফুলী উপজেলায় যেসব বাজার রয়েছে ( যেমন-শিকলবাহা মাষ্টারহাট বাজার, চরপাথরঘাটার পুরাতন ব্রিজঘাট কাঁচা বাজার, কলেজ বাজার, ফকিরনীর হাট বাজার এবং জুলধা পাইপের ঘোড়া বাজার) এসব বাজারে যেসব কাঁচা বাজার বসে। সেগুলো যদি স্ব স্ব কাঁচাবাজারের পার্শ্ববর্তী কোন খালি মাঠে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসানো হত। এমনকি প্রশাসন যদি এই মুর্হুতেই সেই উদ্যোগ নিয়ে অস্থায়ী ভাবে বাজার স্থানান্তরিত করেন। তাহলে সংক্রমণ ঝুঁকিটা অনেকটা কমে যাবে। আমি ইউএনও স্যারকে বিষয়টি দেখার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

দিলদার বেগম (গার্মেন্টস কর্মী): অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবে দেশে হঠাৎ রমজানের আগে করোনা ভাইরাস আসল। এ ধরনের সমস্যায় কখনো আগে দেখিনি। তাই আমাদের মতো যারা বিভিন্ন মিল কারখানায় কাজ করে তারা খুবই খাদ্য সংকটে কষ্টে আছে। যদি সম্ভব হয় সবার ঘরে ঘরে সরকার খাদ্যসামগ্রীর পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত সবমিলিয়ে ৪১৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলো। যার মধ্যে ৫ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। গত ৩, ৫ ও ৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের দামপাড়া, হালিশহর, সাগরিকা এবং সীতাকুন্ডে ৫ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার ১৪টি ভবন, ব্যাংক, দোকান লকডাউন করা হয়।
একই সঙ্গে করোনা আক্রান্ত এক বৃদ্ধের চিকিৎসায় জড়িত তিন চিকিৎসক ও ২০ হাসপাতাল কর্মীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। পরে ঐ বৃদ্ধের ছেলে করোনা পজেটিভ বলে জানা গেলে সুপারশপ দি বাস্কেট এর ৭৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন ও প্রতিষ্ঠানটি লকডাউন করা হয়।
সর্বশেষ, চট্টগ্রামে নমুনা পরীক্ষায় আরও ২ জনকে করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে। তাদের বাড়ি নগরের ফিরিঙ্গিবাজার ও দক্ষিণ খুলশির ইস্পাহানি চত্বর এলাকায়। এদের একজনের বয়স ৩৫ ও অন্যজনের বয়স ৫০।
(চট্টগ্রামের নিউজের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ)