কর্ণফুলীতে আবারো বন্য হাতির আক্রমণে নিহত মহিলা; নির্বিকার বনবিভাগ
চার বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিলেও প্রতিকার নেই
জে.জাহেদ, সিনিয়র রিপোর্টার:
চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দক্ষিণ শাহমীরপুর এলাকার বড়ুয়াপাড়া গ্রামে আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টায় হাতির আক্রমণে পৃষ্ট হয়ে মায়া রানী বড়ুয়া (৬০) নামের এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন।
তিনি একই এলাকার বিকাশ বড়ুয়ার স্ত্রী। এর আগেও হাতির অাক্রমণে নিহত হয়েছে নারী পুরুষ কিংবা শিশু।
বড়উঠান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘প্রায় ৪ বছর ধরে আমার ইউনিয়নের বিভিন্নস্থানে হাতির তাণ্ডবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে মানুষজন। প্রায় সময় তো নিহত-আহত হচ্ছে। বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিও দিয়েছি। তারপরও মিলেনি কোনো সুরাহা।’
কেন বন ছেড়ে বারংবার হাতি লোকালয়ে এসে মানুষ মারছে!
গত দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলে বারবার পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে হাতি। সেসব এলাকাগুলোতে আসছে, যেখানে আগে কখনো হাতির এমন বিচরণ দেখা যায়নি। হাতির আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক মানুষ। নিহতদের তালিকা অনেক লম্বা। প্রতিমাস কিংবা সপ্তাহে বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় নিহতের খবর পাওয়া যায়।

আনোয়ারা ও কর্ণফুলী দুই উপজেলার মাঝামাঝি কেইপিজেডের দক্ষিণাংশে বুনো হাতির উৎপাতে রাত ভর জেগে সতর্ক পাহারায় থাকে কোরিয়ান কোম্পানি কেইপিজেডের নিরাপত্তা কর্মীরাও!
বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, তিন কারণে বন ছেড়ে হাতি এখন লোকালয়ে চলে আসছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল তৈরির জন্য কক্সবাজারের ‘হাতির অভয়ারণ্য’ বন-জঙ্গল কেটে সাফ করা হয়েছে। যে কারণে হাতির আবাস ও চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় ও স্থলমাইন স্থাপনের কারণে হাতি মিয়ানমারে যেতে পারছে না এবং বন-জঙ্গলে হাতির খাদ্যের ব্যাপক অভাব দেখা দিয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, হাতিকে পাহাড়ে রাখার পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে কিংবা তার চাহিদা মেটাতে না পারলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পাহাড়ের নিকটবর্তী আরও বিভিন্ন এলাকা আক্রান্ত হবে, যেখানে অতীতে কখনো হাতির বিচরণ দেখা যায়নি। আর হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর জন্য সনাতন পদ্ধতিতে হাতি তাড়ানোর কৌশল, কৌতুহলী জনতার অতি উৎসাহী আচরণ এবং সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হাতির আক্রমণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় মারা গেছেন ৪৫ জন। এর মধ্যে গত দুই বছরে মারা গেছেন ১৬ জন। ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এসব এলাকায় লোকালয়ে এসে ৮৮টি হাতি মারা পড়েছে। তবে সে সময় হাতি লোকালয়ে আসত বছরে হাতে গোণা দু’তিনবার। গত দু’বছরে লোকালয়ে হাতি এসেছে কমপক্ষে অর্ধশতবার।
জানা যায়, বছরের নির্দিষ্ট সময় হাতির দল মিয়ানমারে যায়, সেখানে থাকে। এরপর আবার কক্সবাজারের টেকনাফে, লোহাগাড়ার চুনতিতে ফিরে আসে। সেখান থেকে আবার পার্বত্য অঞ্চলে যায়। মিয়ানমারের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই হাতিগুলো এখন চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এমনকি পাহাড়ি পথে বোয়ালখালী পর্যন্ত চলে আসছে। বোয়ালখালীতে পাহাড় ছেড়ে ১২ কিলোমিটার ভেতরে দূরে গ্রামের মধ্যে চলে এসেছে। দিন যতই যাবে, হাতিগুলো আরও বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ বলেন, একটি হাতি একবার হাঁটা শুরু করলে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার হাঁটতে পারে এবং এটা তাদের অভ্যাস। পাহাড়ে এখন এত হাঁটার জায়গা কোথায়? তো, তারা যাবে কোথায়? পাহাড় ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে লোকালয়ে চলে আসছে।
তিনি আরো বলেন, হাতি পাহাড়ে খাবার পাচ্ছে না। সেখানে বনায়নের সময় যেসব গাছ লাগানো হয়, সেগুলো হাতির খাদ্য না। আবার হাতির খাদ্য হিসেবে গাছ লাগানো হলেও সেগুলো তো আর দিনে দিনে বড় হচ্ছে না। পাহাড়ের গাছপালাও সাবাড় করা হচ্ছে। একদিকে হাতি বেড়ে গেছে, অন্যদিকে খাবার কমেছে। তাই তারা পাহাড় থেকে পাকা ধান কিংবা তাদের খাবার দেখলেই ছুটে আসছে।

এ বিষয়ে কেইপিজেডের মুখপাত্র এজিএম মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কয়েকদিন যাবৎ দুটি হাতি জঙ্গলে তাড়াতে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। পরে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও বন বিভাগকে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী মোট জমির ৫২ শতাংশ বৃক্ষরোপণ, জলাধার সৃষ্টি ও উন্মুক্ত এলাকা হিসেবে রাখেন। ৮২২ একর জমিতে ২০ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। ৪৭০ একর জমিতে ১৭টি জলাধার সৃষ্টি করা হয়েছে এবং উন্মুক্ত এলাকায় ঘাস লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনোদনের জন্য গলফ কোর্স তৈরি করা হয়েছে। বাকি থাকা ১ হাজার ২০০ একর জমিতে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এ জমির ৩৩ শতাংশে রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছে। ফলে কারখানা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জমি বাকি থাকে ৮৫৮ একর। এর মধ্যে ৫১৬ একর জমির উন্নয়নকাজ শেষ। বাকি ৩৪২ একর জমির উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে। সব মিলিয়ে কেইপিজেডে ও জমি কমছে।