বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখিনি শুনেছি তাঁর আন্দোলন সংগ্রাম ও বীরত্বের ইতিহাস
কে এম রাজীব : আজ থেকে ৪৮ বছর আগের কথা। দিনটি ছিলো ১৫ ই আগষ্ট শুক্রবার ১৯৭৫ সাল। সেই দিন হয়তো যুবক ছিলাম না, ছিলাম ৮/৯ বছরের চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ান বাজার সি এন্ড বি কলোনিস্থ ” আবুল কাসেম প্রাথমিক বিদ্যালয় ” এর শিশু ছাত্র। সকাল ৭ টায় ক্লাস শুরু হবে তাই তৈরি হয়ে রওনা হলাম স্কুল পথে।পথে গিয়ে দেখি মানুষ ছুটোছুটি করছে আর স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা বাড়ি ফিরছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম মানুষের বলাবলি। জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। বাসায় গিয়ে মা বাবাকে বললাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তাই স্কুল ছুটি দিয়েছে। মা বললো, কি বলছিস শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে ? কিন্তু কি দূর্ভাগা শিশু বাঙ্গালি ছিলাম আমি, ইচ্ছা থাকা সত্বেও একটি বার দেখতে পায়নি সেই শেখ সাহেবকে। অথচ হত্যার দুই মাস পূর্বেও তিনি চট্টগ্রাম সফর করেন। কিন্তু দূরের পথ হওয়ায় এক নজর দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৪ ই জুন চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালি উপজেলার বেতবুনিয়া এলাকায় সদ্য স্বাধীন দেশের তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তথ্য প্রযুক্তির উন্নত যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চালু করা দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু। অথচ তিনি এমনি একজন বঙ্গবন্ধু, সেইদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মিত্র শক্তি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে ভারতের ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির কাজ সম্পাদনের কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের দেশে স্বাধীনভাবে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার মাধ্যমেই স্বাধীন দেশে এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি চালু করেন এবং সেদিনেই জীবনের শেষ সফর করেছিলেন জতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আজ সেই মহান নেতার ৪৮ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। আমি বঙ্গবন্ধুকে চোখে দেখিনি, শুনেছি তাঁর আন্দোলন সংগ্রাম ও বীরত্বের ইতিহাস। শুনেছি স্বাধীনতা বিরোধীদের পরাজিত করে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠিত করতে, স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিকামী মানুষকে একত্রিত করার আহবান ১৯৭১ এর ৭ ই মার্চের ভাষণ। শুনেছি মীর জাফরের বংশরা কিছু কুলাঙ্গারকে ব্যবহার করে ৭৫ এর, ১৫ ই আগষ্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সহ স্বপরিবারে হত্যা করার সেই
বিভীষিকাময়ের ইতিহাস। ৭১ এর ২৫ মার্চ যুদ্ধ ক্ষেত্রে যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাহস করেনি পাকিস্তানিরা, অথচ মীর জাফরের বংশরা বঙ্গবন্ধু সহ তাঁর পরিবারে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি, সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত এবং আমির হোসেন আমু’র খালাতো ভাই আবদুল নঈম খান রিন্টুকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে।
সেদিন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করলেও তার মৃত্যু নেই। তিনি চিরঞ্জীব। কেননা একটি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনিই। যতদিন এ রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর থাকবে ববঙ্গবন্ধু। সমগ্র জাতিকে তিনি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই চিরঞ্জীব তিনি এ জাতির চেতনায়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। বিভীষিকাময় ৭৫ এর ১৫ আগষ্টের কালরাতে বাঙ্গালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে ঘাতকরা চেয়েছিলো, বিশ্ব ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাঙ্গালির হাজার বছরের প্রত্যাশার অর্জন স্বাধীনতার আদর্শগুলোকেও হত্যা করতে। মুছে ফেলতে অপপ্রয়াস চালিয়েছিলো বাঙ্গালির বীরত্বগাঁথার ইতিহাসও। বঙ্গবন্ধুর নৃশংসতম হত্যাকান্ড বাঙালি জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাথা হলেও ভয়ঙ্কর ওই হত্যাকাণ্ডে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত না করে বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আড়াল করার অপচেষ্টা হয়েছে। এমনকি খুনিরা পুরস্কৃতও হয়েছে নানাভাবে। এর পরও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র এখনো থেমে থাকেনি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা একের পর এক চক্রান্তের ফাঁদে রয়েছে। অথচ একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে গিয়ে, জাতি গঠনে, একটি স্বাধীন দেশের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়।
জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সহ পরিবারের সকল শহীদদের।