বে-টার্মিনাল সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত
মো. আবুল বশার(পিআইডি) চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রামের হালিশহর উপকূল। বিস্তীর্ণ ভূমি এবং জেগে ওঠা চর। সেই চরে তৈরি হওয়া একটি চ্যানেলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ দেখছে একটি বড় স্বপ্ন। বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও নৌ বাণিজ্যের সম্ভাবনা। বিশ্বায়ন, বড় হতে থাকা চাহিদা ও সরবরাহের অর্থনীতি, প্রযুক্তির উন্নয়ন বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে নৌপথের বাণিজ্যে। পাল তোলা জাহাজের পরিবর্তে গভীর ড্রাফটের বিশাল বিশাল জাহাজ এখন পণ্য পরিবহন করছে।
বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে কিছুটা দূরে কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দর দিন দিন লাইটার জাহাজের বন্দরে পরিণত হতে চলেছে। ৯ মিটার বা তার চেয়ে কম ড্রাফটের জাহাজ ছাড়া এখানে ভিড়ানো অসম্ভব। ফলে বহির্নোঙ্গরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে লাইটারেজে। সাথে জোয়ার ভাটার সময়ক্ষেপণতো আছেই। অথচ জেটির গভীরতা দুই/তিন মিটার বেশি হলেই অনেক বড় বড় জাহাজ ভিড়তে পারতো চট্টগ্রাম বন্দরে। সাশ্রয় হতো বিপুল অর্থের।
পৃথিবীর নামকরা বন্দরের একটি সিঙ্গাপুর পোর্ট। এই বন্দর গড়ে উঠেছে সাগর ভরাট করা ভূমিতে। একই নজির আছে দুবাই পোর্টের ক্ষেত্রে। এই রকম বন্দরের আদলে উপকূলের প্রায় ৯০০ একর ভূমি এবং সাগরের ১৬০০ একর ভূমি উদ্ধার করে গড়ে তোলা হবে আগামী দিনের বে-টার্মিনাল।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে বে-টার্মিনালকে বলা হচ্ছে ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের ইতিহাসে সবচেয়ে পরিকল্পিত ও সর্ববৃহৎ সম্প্রসারণ বলা চলে। সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধারের পর বে টার্মিনালের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ২৫০০ একর। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল এরিয়ার পরিমাণ ৪০০ একর। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের খেজুরতলা থেকে কাট্টলী পর্যন্ত অংশে পলি জমে ১১ কিলোটিমার দীর্ঘ একটি চর সৃষ্টি হয়েছে। এই চরেই নির্মাণ করা হবে বে-টার্মিনাল। এই চর ও উপকূলের মাঝামাঝি প্রায় ৮‘শ মিটার প্রশস্ত জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি হয়েছে। এই পথের গভীরতা ৭ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত। খনন করলে এই পথে ১০ থেকে ১২ মিটার ড্রাফট ও ৩০০ মিটার দৈর্ঘের জাহাজ চালানো সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে দিনে জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ চার ঘণ্টায় নয় দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফট ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘের জাহাজ চলাচল করতে পারে। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে দিনে-রাতের যে কোনো সময়ে এর চেয়ে বেশি দৈর্ঘ্য ও ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। পাঁচটি কম্পোনেন্টের সমন্বয়ে গড়ে ওঠবে আগামীর বন্দর বে টার্মিনাল। দুটি কন্টেনার টার্মিনাল। একটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২২৫ মিটার এবং অপরটির দৈর্ঘ্য ৮৩০ মিটার। ১৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল একটি। ৫ কিলোমিটার ব্রেকওয়াটার এবং ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং।
বন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিশ্বের নয়টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বে-টার্মিনালের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তালিকায় আছে বারোটি দেশে টার্মিনাল অপারেট করা খ্যাতনামা সংস্থা পিএসএ সিঙ্গাপুর, আফ্রিকাসহ নানা দেশে বন্দর নির্মাণ করে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং করা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড, আফ্রিকার কয়েকটি দেশে বন্দর তৈরি ও পরিচালনাকারী সৌদি রাজ পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল লিমিটেড, চীনের ব্যস্ততম সাংহাই পোর্ট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংস কোম্পানি লিমিটেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই গ্রুপ। তবে নির্মাণ ব্যয়ের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে দেবে বলেও প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড প্রস্তাব করেছে যে, তারা বন্দর নির্মাণ করবে। তবে ব্রেক ওয়াটারের অংশ তারা করবে না। এটি চট্টগ্রাম বন্দরকে করে দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কেউ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করতে আগ্রহী নয়। শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই গ্রুপের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তারা ব্রেক ওয়াটারও করবে। পোর্টও করবে। ভূমিও তারা রিক্লেইম করবে। তারা ঋণের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব দিয়েছে। হুন্দাই গ্রুপ ত্রিশ বছরের চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে। তারা সবকিছু করে টার্মিনাল নির্মাণ করবে। ত্রিশ বছর পর তারা চলে যাবে। তথ্যগুলো নানা সূত্র থেকে পাওয়া।
এছাড়া গত ১৮ নভেম্বর নৌমন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বন্দরের মাস্টারপ্ল্যান ও ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য ডিসেম্বরে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠকে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান বে টার্মিনাল দ্রুত আলোর মুখ দেখবে বন্দরকে ঘিরে যে অপার সম্ভাবনা তা কাজে লাগাতে হবে সতর্ক বিবেচনা ও কৌশলী সিদ্ধান্ত গ্রহনের মাধ্যমে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে সরকারের যে কয়টি মেগাপ্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে বে টার্মিনাল হচ্ছে সবচেয়ে কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য। প্রকল্পের পশ্চাৎসুবিধা বিশেষ করে সারা দেশের সাথে সড়ক, রেল ও নৌ পথের যোগাযোগ একেবারে তৈরি অবস্থায় আছে বলা যায়। ফলে বে টার্মিনালের দ্রুত বাস্তবায়ন দেশের বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির গতি ঊর্ধগামী হবে। চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরপারে সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বে টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। আগামীর বন্দর বলে খ্যাত বে টার্মিনালে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জাহাজ চলাচল করতে পারবে। প্রসঙ্গত, বর্তমান জেটিতে জোয়ার ভাটার নির্ভরতা রয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান জেটিতে কোনো জাহাজকে বার্থ করতে হলে সাগর থেকে ১৫ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে হয় কিন্তু বে টার্মিনাল হলে এক কিলোমিটারের মধ্যে জেটিতে বার্থ করতে পারবে জাহাজগুলো।
বিদ্যমান বন্দরের জেটিতে একসাথে ১৯টি জাহাজ ভিড়তে পারলেও বে টার্মিনালে প্রায় ৩৫টি জাহাজ একসাথে বার্থ করতে পারবে। এমন অনেক সুবিধা রয়েছে বে টার্মিনালের। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সবার আগে প্রয়োজন বে-টার্মিনাল। সাগরের উপকূলের এই ভূমির পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে, পর্যাপ্ত ভূমি এবং রেললাইনসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যে হারে আমদানি রপ্তানি বাড়ছে সেজন্য এখনই তা প্রয়োজন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ৬৭ একর ভূমি বরাদ্দ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসনকে ৩৫২ কোটি ৬২ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ ঘোষণা করেছিলেন, ‘এক বছরের মধ্যে বে টার্মিনালে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মিত হবে। আর তা হলে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন আসা যাওয়া করা প্রায় চার হাজার ট্রাক-লরিকে নগরের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে না।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ইয়ার্ড নির্মিত হয়নি। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য যে প্রকল্পটি নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল সেই প্রকল্পটি অনুমোদনই পায়নি। কিন্তু অনুমোদনের আগেই নৌ কল্যাণ সংস্থাকে দুটি ইয়ার্ড নির্মাণের মাটি ভরাটের কাজের অনুমোদন দেয়। মাটি ভরাটের কাজ চলমানও রয়েছে।
বে টার্মিনালে সবার আগে প্রয়োজন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা। বে টার্মিনাল নিয়ে একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা অর্থাৎ একটি মাস্টারপ্ল্যান করার প্রয়োজন ছিল। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সেই মাস্টারপ্ল্যান বা পরিপূর্ণ স্টাডির কাজটি একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতো। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণসহ পুরো বে টার্মিনালের সামগ্রিক কাজ করা হতো। কিন্তু সেই স্টাডি তো হয়নি। এখন সেই স্টাডি করার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারের অনুমোদন পাওয়া গেলেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের স্টাডি রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্রেক ওয়াটার ও চ্যানেল নির্মাণে অর্থায়ন কে করবে এবং টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব কাকে দিয়ে করা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু সবকিছু নির্ভর করছে স্টাডি রিপোর্টের ওপর। ইপিজেড থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরের ভেতরের প্রায় ২ হাজার ৩‘শ একর জায়গায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফটের বিবেচনা কর্ণফুলী নদীর জেটিতে ভিড়লেও বে-টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই।
বে টার্মিনাল নির্মাণ হলে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বিপরীতে বর্তমান চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। সেইক্ষেত্রেও জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু বে টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। বন্দরের জেটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটার হলেও বে টার্মিনালের দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার। মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, কর্ণফুলীর ওপারে চায়না ইকোনমকি জোন এবং আগামীতে উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব সহজে সাপোর্ট দিতে পারবে ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া এই বে টার্মিনাল।