চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ সংকটে এইচআইভি (এইডস) রোগী


            মোঃ কামাল হোসেন

এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত হয়ে সংক্রমিতদের মধ্যে রয়েছেন নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী, সমকামী, যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রবাসী শ্রমিক, হাসপাতালে প্রসব সেবা নিতে আসা মা, রোহিঙ্গা ও হিজরা। বিশ্বব্যাপী আধুনিক ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্ভাবনের ফলে এইচআইভি (এইডস) এ আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার অনেক কমে এসেছে। তবে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার হিসেবে এখনো বেশি না হলেও এইডসে আক্রান্তদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের এইচআইভি-এইডস বিষয়ক সংস্থা ইউনিএইডস। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এইডস আক্রান্ত রোগীও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সম্ভবনা রয়েছে সংস্থাটি’র অভিমত। সংস্থাটির তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন এইডস আক্রান্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ০.১ শতাংশ। ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি। তবে দেশে চিকিৎসার আওতায় রয়েছে মাত্র আট হাজার রোগী। বাংলাদেশের জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এইডসে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীদের চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসার হার প্রতিবছর বাড়ছে।
জাতিসংঘের চাহিদা অনুযায়ী, এইডস আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবায় নিয়ে আসার জন্য লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৯৫ শতাংশে নিয়ে আসা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে এটাই সংস্থাটির উদ্দেশ্য ইউ এন এইডসের বাংলাদেশে নিযুক্ত কান্ট্রি ম্যানেজার ড. সায়মা সুত্রে জানাযায়, বর্তমানে আধুনিক অনেক ঔষধ আছে যেটার সাইড ইফেক্ট অনেক কম কিন্তু কার্যকারিতা অনেক বেশি। এটা দেহের ভাইরাস অনেক কমিয়ে দিতে পারে, একেবারে নির্মূল করতে পারে না। তবে নিয়মিত ঔষধ সেবনে এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তি একেবারে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। বর্তমানে এইডস রোগীদের ঔষধ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা সরকারি দায়িত্বরত সংস্থার অবহেলা। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে ঔষধ সংকট হওয়ার কথা নয়। ঔষধ সেবনে অনিয়মিত হলে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে।

এইডস রোগ প্রতিরোধে কাজ করে, এমন একটি সংগঠনের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিডার সুত্রে জানাযায়, বর্তমানে প্রতিটা এআরটি সেন্টারে মেডিসিন সংকট দেখা দিয়েছে যা স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়া যায় না। সরকারি দায়িত্বরত সংস্থার ব্যাপক অবহেলার কারণে এইসআইভি এইডস রোগীরা এই সংকট কাল অতিক্রম করছে। যা তাদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এআরটি সেন্টারে দায়িত্বরত ডাঃ দেবপ্রতিম বড়ুয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এইডস রোগীরা ঔষধ পাচ্ছে না এটা ঠিক, তবে স্বাস্থ্য পরিচালক মহোদয় বরাবরে এব্যাপারে দরখাস্ত করেছি। হয়তো এক সপ্তাহের মধ্যেই ঔষধ পেয়ে যাবো। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর রেজাউল করিম, “ঔষধ নাই” এ কথা স্বীকার করে এ প্রসঙ্গে বলেন, ঔষধ আসে ঢাকা সিএমএইচ থেকে, তদারকি করে এনএসপি। তাদেরকে এবিষয়ে অবহিত করেছি। কক্সবাজার ও ওকিয়া হাসপাতালে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাও ঔষধ সংকটের কথা স্বীকার করেন। তবে হঠাৎ কেন এইডস রোগীদের ঔষধ সংকট এব্যারে সরকারি দায়িত্বরত উর্ধতন কর্মকর্তাদের নিকট থেকে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
এইডস শনাক্ত করার জন্য সারা দেশে ২৭টি কেন্দ্র রয়েছে আর চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় ১১টি কেন্দ্র থেকে। সরকারি দায়িত্বরত সংস্থা ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এইআইভি প্রতিরোধে কাজ করলেও মাঠ জরিপে দেখা যায়, ১ মার্চ থেকে আক্রান্ত রোগীরা মেডিসিন সংকটে আছে। তারা ১৫/১৬ দিন ধরে ঔষধ সেবন করতে পারছে না। বর্তমানে এইডস রোগীরা ঔষধ সেবন করতে না পারায় তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দিনদিন অবনতি হচ্ছে। এভাবে এইডস রোগীরা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার বা দায়িত্বরত সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দেশে ব্যাপক হারে এইডস রোগ ছড়ানোর সাথে সাথে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জানা যায়, শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ জনের উপরে, কক্সবাজার হাসপাতালে ৪০০ জনের উপরে, উখিয়া সদর হাসপাতালে ৩০০ জনের উপরে এইচআইভি (এইডস) রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
এইচআইভি (এইডস) রোগে আক্রান্ত কয়েকজন রোগীর নিকট তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, এইডস হলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, যারা জানে না তারাই শুধু এই কথা বলে। নিয়মিত ওষুধ খেলে একজন রোগীও এই রোগের কারণে মৃত্যুবরণ করবে না। তারা বলেন, আমরা নিজেরা ওষুধ খেয়ে ভালো ছিলাম, আমাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দিনদিন ভালোর দিকে যাচ্ছিলো, কিন্তু বর্তমানে হঠাৎ ঔষধ সংকটে আমরা। ১৫ দিন ধরে আমাদেরকে ঔষধ দেওয়া হচ্ছে না। ঔষধ সেবন করতে না পেরে আমাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পূনরায় খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে হয় বাঁচবো না। তারা এ প্রসঙ্গে মাননীয় মানবিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
চট্টগ্রামের বর্তমান সিভিল সার্জন মোঃ ইলিয়াছ চৌধুরী প্রসঙ্গটি তাদের নয় বলে জানান। তবে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইডস রোগীদের চিকিৎসা সেবায় এআরটি সেন্টার আছে। সেখানে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানার মত পোষণ করেন।
পিএলএইচআইবি নেটওয়ার্ক সংগঠনের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে এপ্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা বলেন, এইডস রোগের চিকিৎসা সেবায় আমরা অনেক চেষ্টা করছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিএমএইচ এর সাথে যোগাযোগ করে যাচ্ছি যাতে খুব দ্রুত ঔষধ পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিএমএইচ এর কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে ঔষধ সংকট দেখা দিয়েছে বলে মত পোষণ করেন নেটওয়ার্ক নেতৃবৃন্দ।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ফজল আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ”এইডসে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের অনেকে দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন। তাদের খাবার, কর্মসংস্থান, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন দরকার। কিন্তু সেটাও এখানে হচ্ছে না। অনেকের এইচআইভি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের রোগ আছে, সেটার চিকিৎসার জন্য তাদের জন্য আলাদা খুব বেশি সুবিধা নেই।” রোগীদের চিকিৎসা সেবার আওতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য ছিল তা গত কয়েক বছরের তুলনায় সেটা বেড়েছে তবে বর্তমান ঔষধ সংকটকাল অতিক্রম করতে সরকার তথা দায়িত্বরত সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ফজল আহমদ।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.