করোনা পরবর্তী বাংলাদেশ নামক দেশটির চেহারা কেমন হবে


সৈয়দ নুরুল ইসলাম:
করোনা পরবর্তী বাংলাদেশ নামক দেশটির চেহারাটা কেমন হবে? প্রশ্নটা নিয়ে গত বছর এই দিনে ভেবেছিলাম। আজও একই ভাবনা। সারাদিন ভেবেছি। যেখানে ইউরোপ-আমেরিকা করোনার কাছে হেরে গেছে সেখানে আমাদের মত উঠতি অর্থনীতির একটি দেশ কিভাবে টিকে থাকবে! ফোন করে জানতে চাইলাম সদ্য বিশ্বব্যাংকের চাকুরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসা এক তরুণ অর্থনীতিবিদ বন্ধুর কাছে। ছোট একবাক্যে তার উত্তর-‘জীবন থাকলেইতো জীবিকা, আর জীবিকার জন্যই অর্থনীতি।’ আমি বুঝে নিলাম সে কি বলতে চেয়েছে। আমি অর্থনীতির ছাত্র না। বাণিজ্য নিয়ে পড়ালেখা করেছি। আর বাণিজ্যের পেছনেই কাটিয়েছি প্রায় ৩৫ বছর। আমি  জীবন আর জীবিকা দুটোকে একই সুতায় বাধা দেখি।

করোনার থাবায় পুরো ২০২০ সাল ছিল থেমে থাকার বছর। ভেবেছিলাম ২০২১ সালে নতুন সূর্য্য উঠবে। জানুয়ারির প্রথম দিকে সূর্য্যটা উঁকিও দিয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সূর্য্যটাকে আবার ঢেকে দিল। আমাদের জীবন আবারো বিপন্ন। অর্থনীতিও দিক হারা। কিন্তু গত বছরের অভিজ্ঞতা বলে যে অমরা সবাই করোনার কাছে জীবন বিসর্জন দিয়ে হারিয়ে যাব না। করোনার সাথে যুদ্ধ করে জীবন আমরা ফিরে পাব। গত বছরের নববর্ষের মত এবারও না হয় গাইলামনা গান। আগামী নববর্ষে অবশ্যই অবশ্যই বাঙালি নতুন করে সাজবে। নতুন সুরে গাইবে।

জীবন নিয়ে আমি আমার অর্থনীতিবিদ বন্ধুর মত যতটা না উদ্ধিগ্ন তার ছেয়ে আরো অনেক বেশি উদ্ধিগ্ন জীবিকা নিয়ে! করোনা পরবর্তী  জীবিকার মূল চালিকা শক্তি অর্থনীতির কি হবে?

গত ১০-১২ বছরে আমাদের অর্থনীতিতে বসন্ত আসার আগেই ফুল ফুটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ ঘাটতি কাটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন, বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপর। করোনার আঘাতে আমাদের রপ্তানী আয় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কাছাকাছি নেমে এলেও বিদেশে কাজ করা আমাদের প্রায় ১ কোটি সোনার ছেলেদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপর নিয়ে গেছে। আমাদের অর্থনীতির মুল শক্তি কৃষি। করোনার কাছে  আমাদের কৃষকরা এখনো  মাথানত করেননি। সব মিলিয়ে করোনাকালীন মহাসংকট মোকাবেলা করে আমাদের মাথাপিছু আয়ও বেড়ে ২০০০ মার্কিন ডলারের উপরে। যার উপর ভিত্তি করে বিশ্ব ব্যাংকের স্বীকৃতি আজ আমরা উন্নয়নশীল দেশ। নিজের অর্থে গড়া পদ্মা সেতুর স্প্যন গুলোর দাঁড়িয়ে গেছে। মেট্রোরেলের পিলারগুলোও দৃশ্যমান। অর্থনীতির মূল জায়গা আভ্যন্তরিন চাহিদা, সেখানেও নড়াচড়া বন্ধ হয়নি। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার হার, গড় আয়ু  সব মিলিয়ে আমাদের স্বপ্ন পুরণের স্বপ্নটা এখনো হারিয়ে যায়নি।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের অর্জন গুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জের র মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। রপ্তানি অনিশ্চিত। তার অর্থ উৎপাদন কমে যাওয়া। উৎপাদন কমে যাওয়া মানে চাকুরী হারা মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে হওয়া। আর চাকুরী হারা মানে পকেট খালি।

পকেটে টাকা না থাকলে মানুষের কেনা কাটা কমে যাবে, যেটাকে বলে বাজারের চাহিদা কমা। বাজারের চাহিদা কমে যাওয়া মানেই আবার উৎপাদন কমে যাওয়া। আরো কর্ম সংস্থান কমে যাওয়া।এভাবে কমার চক্রে অর্থনীতির চাকার গতিও কমে আসবে। আলোকিত ঢাকার আলো আস্তে আস্তে নিভে যাওয়া। বড় বড় কর্পোরেট হাউসগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়া। খেলাপিদের কাছে হেরে গিয়ে ব্যাংকগুলোর সদর দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। কাজ হারা মানুষগুলোর চেহেরাগুলো  মলিন হওয়া। মধ্যবিত্তের ফুটানি ফিকে হয়ে আসা। উচ্চ বিত্তেদের পালিয়ে যাওয়া।

তারপর? তারপর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম! আর একটি যুদ্ধ। আর একটি ৭১। এবারের যুদ্ধ অস্ত্র হাতে না,কাস্তে হাতে। সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রটা আমাদের সেই কৃষি। আবার সেই কৃষক-যারা একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সড়া দিয়ে খালি গায়ে, খালি হাতে যুদ্ধ করে পাক হানাদারদেরকে হটিয়ে আমাদের একটি লাল সবুজে মোড়ানো স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছে। তারাই আবার সামনে  থেকে লড়াই করে আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে। তারাই নতুন করে ফুল ফুটাবে। লাল সবুজের পতাকা হাতে ঢাকার রাস্তায় নতুন করে আলো জ্বালাবে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: ভাইস চেয়ারম্যান, ওয়েল গ্রুপ।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.