রোজা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে


করোনাকালের এ সময়ে মাহে রমজান আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে সুস্থ থাকা এবং নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর চমৎকার সুযোগ। রমজান আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবেই সাধারণভাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা যদি খুব গভীরভাবে দেখি তাহলে আমরা দেখব যে রমজান হচ্ছে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও আত্মিকভাবে সুস্থ থাকা, ভাল থাকার মাস। তবে প্রচলিতভাবে আমাদের রোজা পালনে অনেক অশুদ্ধ জীবনাচার দেখা যায়। বিশেষ করে ইফতার ও সেহেরীতে খাদ্য উৎসব। করোনাকালের এ সময়ে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিবে।

আমরা হাজার বছর ধরে বুঝিনি কেন রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, তোমরা রোজা রাখো যাতে তোমরা সুস্থ থাকতে পারো।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা দিয়ে তাবারানিতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, ‘রোজা রাখো যাতে তোমরা সুস্থ থাকতে পারো।’

একসময় আমাদের কারো কারো মধ্যে ধারণা ছিল যে রোজা রাখলে সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এই ধারণা যে কত ভ্রান্ত ছিল রসুলুল্লাহর (সা.) এই বাণী যে কত নির্ভুল, এই নির্দেশনা যে কত নির্ভুল তা প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করলেন জাপানি গবেষক ইউশিনোরি ওশুমি।

তিনি তার গবেষণায় খুব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন রোজা বা উপবাস কীভাবে দেহকে টক্সিনমুক্ত করে, ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। অটোফেজি নামে এই গবেষণার জন্যে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

অটোফেজি বা রোজা বা উপবাস নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং তাতে খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে প্রদাহ, জ্বালাপোড়া, ব্যথা, সংক্রমণ, ফুলে যাওয়া এটা উপবাসে কমে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। বার্ধক্য প্রতিরোধ করে। মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হয়।

অটোফেজিকে জাপানি গবেষক ওশুমি যেভাবে শরীরের শুদ্ধি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেই একই বর্ণনা আমরা পাই ইবনে মাজাহ শরিফে হযরত আবু হুরায়রা বর্ণিত রসুলুল্লাহ’র (সা.) হাদীসে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সবকিছুর যাকাত রয়েছে। যাকাত অর্থ হচ্ছে শুদ্ধি প্রক্রিয়া, শরীরের যাকাত হচ্ছে রোজা।

শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, আত্মিক সবদিক থেকেই আপনি ভাল থাকতে পারেন যদি আপনি আল্লাহর রসুল যেভাবে রোজা রাখতে বলেছেন সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। যারা রোজা রাখবেন তারা সবচেয়ে ভালোভাবে রাখবেন। আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে প্রতিটি কাজ তুমি সবচেয়ে ভালোভাবে করবে। রোজার পুরো উপকার পাওয়ার জন্যে খাবার-দাবার থেকে শুরু করে সব ব্যাপারেই সংযম অবলম্বন করতে হবে।

আজেবাজে অপ্রয়োজনীয় কথা, চেঁচামেচি করা, বকাবকি করা বা ঝগড়া-বিবাদ থেকে পুরোপুরি দূরে থাকতে হবে। পরনিন্দা, পরচর্চা, গীবত বর্জন করতে হবে। এমন কী খাবার ক্ষেত্রে বিশেষ পরিমিতি বোধ বজায় রাখা হলো রমজানের অন্যতম শর্ত।

মূলতঃ করোনাকালের এই সময়ে সঠিক ও সুষম খাদ্যাভ্যাস কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যা আমাদের দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বতোভাবে কর্মক্ষম করে তোলে। যে-কোনও ক্ষতি কাটিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে মেরামত ও পুনরুদ্ধার করে। নানা রকম সংক্রমণ ও অসুস্থতার বিরুদ্ধে আমাদের দেয় সংহত সুরক্ষা।

রমজানের এই সময়ে খাবারে অতিরিক্ত তেল, মশলা, টেস্টিং সল্ট, কাঁচা লবণ, ঝাল ও ভাজাপোড়া বর্জন করুন। রেস্তোরাঁ ও বাইরের খাবার যত কম খাবেন তত ভালো। ভোজ্যতেলের ধরন যাই হোক না কেন কম-বেশি সবই চর্বিবর্ধক। তাই তরকারিতে পরিমিত তেল ব্যবহার করুন। ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত কৃত্রিম খাবারে রয়েছে কালার, ফ্লেভার, টেস্টার এবং এডিক্টিভ উপাদান। এ সময়ে এসব খাবার গ্রহণ শরীরের হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

আমরা রমজান মাসে চিনির শরবত এবং চিনি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করি। এবারের রমজানে বিশেষভাবে বর্জনীয় হোক চিনি এবং চিনিজাত সকল দ্রব্য। চিনি এমনিতেই বিষ এবং স্থূলতা, হৃদরোগ, ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলোর একটি হচ্ছে চিনি। শরবত, সিরাপ, মিষ্টি অর্থাৎ চিনিজাতীয় যত খাবার রয়েছে, এবারের রমজানে পুরোপুরি বর্জন করবেন। তাহলে আপনার সুস্থতা এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আপনি নিজেই অনুভব করবেন। এসময় দেশীয় ফল খেজুর, ডাবের পানি, টক দই, লেবুপানি, শাক-সবজি, দুধ, সয়াদুধ, মাংসের মধ্যে মুরগি, মাছের মধ্যে সামুদ্রিক মাছ- ইফতার পরবর্তী এই খাবারগুলো রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

চিকিৎসকেরা বলেন, সেহরিতে সবচেয়ে হালকা খাবার শরীর সুস্থ্য রাখতে সাহায্য করে। অল্প সবজি, অল্প ভাত বা রুটি এবং একটু ফল থাকতে পারে। সেহরি যত হালকা করবেন, আপনার শরীরটা তত ঝরঝরে হালকা থাকবে। আসলে নবীজী যে এত সুস্থ ছিলেন, প্রাণবন্ত ছিলেন তার কারণ হচ্ছে ইফতারও তিনি হালকা করতেন, সেহরিও হালকা করতেন।

অফুরন্ত সওয়াব ও দানের মাস রমজান। রমজান আমাদের সামনে অফুরন্ত নেকি অর্জনের সুযোগ এনে দিয়েছে। রোজা রাখার যে নেকি, রোজা রাখার যে পুণ্য, রোজা রাখার যে সওয়াব- আল্লাহতায়ালা বলেছেন যে, ‘এই সওয়াব আমি নিজে দেব’। হযরত আবু হুরায়রা বর্ণিত মুসলিম শরিফের হাদীস হচ্ছে, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, ‘মানুষের প্রত্যেকটি সৎকর্মের নেকি আল্লাহ গুণিতক করেন। দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি দান করেন। আর রোজার নেকি আল্লাহ নিজে দেবেন কোনো সীমা ছাড়া তার ইচ্ছানুসারে।’ রোজা রাখার যে নেকি এটা তো রয়েছে এবং রসুলুল্লাহ (সা.) রোজার মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। কারণ, দানের সওয়াব সাতশ’ গুণ থেকে শুরু হয় এবং রোজাতে এই সাতশ’ গুণের উপরে আল্লাহতায়ালা তার ইচ্ছামতো নেকি দেন।

যাকাত আদায় এমনিতে ফরজ। আর রমজান মাসে যখন আপনি যাকাত আদায় করবেন, এর সওয়াবও অনেক অনেক অনেক গুণ আল্লাহতায়ালা বাড়িয়ে দেবেন।

রমজান মাসে একটি মহৎ কাজ, ভালো কাজ আপনার নেকির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তা হচ্ছে কোরআনের জ্ঞান। কোরআন রমজান মাসে নাযিল হয়েছে। যে কারণে রমজান মাসের বরকত এত বেশি। কোরআন হচ্ছে বিশ্বাসীর জন্যে রহমত এবং শেফা, নিরাময়। এই নিরাময় শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, আত্মিক সব ক্ষেত্রেই। তাই কোরআনের ধ্যানে ডুবে যান।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.