তথ্য অধিকার আইন : দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য নির্দেশিকা


তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যেই তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ প্রণীত হয়েছে। সংবিধান মতে যেহেতু জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক সেহেতু জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। জনগনের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশী অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

প্রকৃতপক্ষে তথ্যের অধিকার ছাড়া সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত চিন্তা , বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা অকল্পনীয়, তথ্যের আদান প্রদানের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের জন্য তথ্য জানা অপরিহার্য। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। সকল উন্নয়ন কার্যক্রম, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর তথ্য জনগণকে জানাতে হবে। তথ্য অধিকার আইনমতে বিভিন্ন কার্যালয়কে জনগণের এ সকল অধিকারের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক।

তথ্য অধিকার আইনের বাস্তব রুপদান করতে এর প্রায়োগিক ক্ষেত্রটিকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা আবশ্যক। অন্যথায় এই আইনের উপযোগিতা বাংলাদেশের নগরিক জীবনে যথার্থভাবে অনুভূত হবে না। এক্ষেত্রে নাগরিকগণের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কথায়, কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য প্রাপ্তির নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সক্রিয় ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ও আন্তরিকতা, আচরণ, তথ্য সেবা প্রদানের মানসিকতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যতম প্রধান নির্ধারক । সুতরাং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সুদক্ষ কর্ম সম্পাদনের স্বার্থে একটি নির্দেশিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

১.তথ্য (আইনি পরিভাষায় এর পরিধি), ২.তথ্য প্রাপ্তির নাগরিক অধিকার ও এর গুরুত্ব, ৩. যে সকল তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক নয়, ৪. তথ্য প্রদান ইউনিট, ৫. তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সংস্থা, ৬. তথ্য প্রদান কর্তৃপক্ষ, ৭.আপীল কর্তৃপক্ষ, ৮.তথ্য প্রদানের সময়সীমা সংক্রান্ত নিয়মাবলী, ৯. তথ্যের জন্য আবেদন করার নিয়মাবলী ও নির্ধারিত ফরমসমূহে, ১০. তথ্য প্রদানের জন্য ফি আদায় সংক্রান্ত নিয়মাবলী, ১১. স্ব-প্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, ১২. তথ্য প্রদানের বার্থতাজনিত শাস্তি, ১৩. তথ্য অধিকার আইনের প্রাধান্য, ১৪. তথ্য কমিশনের সাথে যোগাযোগের বিষয় ও পদ্বতি।

তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণের নিমিত্ত এই আইন প্রণীত হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক এবং চিন্তা বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। তথ্য অধিকার আইন জনগণের এই অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করেছে।

সরকারি, স্বায়ত্তশসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, সরকারি ও বিদেশী অর্থায়নের সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থা, কোন আইন দ্বারা বা আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার বা কোন সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িতপ্রাপ্ত কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ড সস্পাদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ করে জনগণের ক্ষমতায়ন এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।

প্রতি বছর ৩১ মার্চ এর মধ্যে তথ্য কমিশন পূর্ববর্তী বছরের তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত তথ্যাদি সংগ্রহ পূর্বক একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যা মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট দাখিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়। এই প্রতিবেদনে পূর্ববর্তী বছরে কতগুলো তথ্যের আবেদন হয়েছে। যে সকল আবেদনের প্রেক্ষিতে তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। কতগুলো আপিল আবেদন করা হয়েছে। কতগুলো আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য সরবরাহ করার আদেশ হয়েছে। কতগুলো আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দাখিল হয়েছে। সারা দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক তথ্যের মূল্যবাবদ বছরে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ কত ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পুরো বছরের তথ্য সংগ্রহ করে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য কমিশনে প্রেরণ নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর ধারা ১০ অনুযায়ী নিযুক্ত কর্মকর্তা) নিজ কর্ম সম্পাদনের দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত ও সচেতন থাকলে নাগরিক চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে কোন জটিলতার সৃষ্টি হবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আইনসিদ্ধ সচেতন অবস্থান গ্রহণ যথার্থ হলে কোন আবেদনকারী নাগরিককে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিবাদী পক্ষ হিসেবে তথ্য কমিশনে শুনানীর জন্য হাজিরা দেওয়ার অবকাশ তৈরি হবে না। তথ্যের জন্য আবেদনকারী ও তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ উভয়ের জন্য যে কোনরূপ হয়রানি, সময় ও শ্রম এড়াতে নাগরিক জীবনে অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা অপরিসীম।

লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, পিআইডি চট্টগ্রাম।


আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.